যুক্তরাজ্যের ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ৪০ বছর
- আপডেট : ১১:৪০:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
- / 7
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ৪০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৯৮৬ সালের ৬ নভেম্বর উত্তর সাগরে (নর্থ সি) চিনুক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারান ৪৫ জন। ওই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মাত্র দুজনের একজন ছিলেন হেলিকপ্টারটির ক্যাপ্টেন পুষ্প বৈদ। চার দশক পরও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি তিনি।
বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সী পুষ্প বৈদ মনে করেন, দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরাটা ছিল নিছক ভাগ্যের ব্যাপার। বিবিসি স্কটল্যান্ড নিউজকে তিনি বলেন, ‘৪৫ জন মানুষ বাঁচতে পারলেন না, অথচ আমরা দুজন কীভাবে বেরিয়ে আসতে পারলাম, তা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না।’
দুর্ঘটনার ৪০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার দৃশ্য পুনর্নির্মাণ করেছেন তিনি।
যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা
১৯৮৬ সালের ৬ নভেম্বর। দিনটি ছিল সুন্দর, আবহাওয়াও ছিল শান্ত। উত্তর সাগরের ব্রেন্ট তেলক্ষেত্র থেকে ৪৭ জন আরোহী নিয়ে চিনুক হেলিকপ্টারটি ফিরছিল। গন্তব্য ছিল শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সামবুর্গ বিমানবন্দর।
অবতরণের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হেলিকপ্টারটির ভেতরে অস্বাভাবিক শিসের মতো শব্দ শুনতে পান পুষ্প বৈদ। প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুতর মনে হয়নি। তাঁদের ধারণা ছিল, হিটারের মতো কোনো যন্ত্রের ত্রুটি থেকে শব্দটি হতে পারে।
কিন্তু ধীরে ধীরে শব্দ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিকট বিস্ফোরণের মতো আওয়াজ হয়।
পুষ্প বৈদের বর্ণনা অনুযায়ী, হেলিকপ্টারটির সামনের গিয়ারবক্স ভেঙে যায়। এর ফলে ঘূর্ণায়মান দুটি রোটর একে অপরের খুব কাছে চলে আসে এবং সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পেছনের রোটরটি হেলিকপ্টার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তিনি বলেন, হেলিকপ্টারটি তখন ঘণ্টায় প্রায় ১০০ নট গতিতে চলছিল। রোটরের সংঘর্ষের পর মুহূর্তেই গতি ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি প্রায় উল্লম্ব অবস্থায় চলে যায়। সামনে আকাশ দেখতে পান তিনি। বিচ্ছিন্ন রোটরের একটি অংশ ককপিটের উইন্ডস্ক্রিনে আঘাত করে।
এরপর ককপিটটি মূল যাত্রীকক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হেলিকপ্টারটি সজোরে উত্তর সাগরের পানিতে আছড়ে পড়ে।
পানির নিচে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই
দুর্ঘটনার পর পানির নিচে চলে যান পুষ্প বৈদ। কোনোভাবে সাঁতরে পানির ওপরে উঠে আসতে সক্ষম হন তিনি। ওপরে উঠে চারদিকে শুধু হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান।
তবে তাঁর মনে আশা ছিল, কাছাকাছি একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের প্রশিক্ষণ মহড়া হওয়ার কথা। সেটি তাঁকে উদ্ধার করতে আসবে।
শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এসে পুষ্প বৈদ ও অপর জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। তাঁদের প্রথমে লারউইকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাঁদের অ্যাবারডিনে স্থানান্তর করা হয়।
বেঁচে ফেরার অপরাধবোধ
দুর্ঘটনার পর প্রথম বছরগুলোতে বেঁচে ফেরার কারণে একধরনের অপরাধবোধে ভুগতেন পুষ্প বৈদ। তাঁর মনে হতো, ৪৫ জন প্রাণ হারালেন, অথচ তিনি বেঁচে আছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রথম বছর আমার মনে হতো, আমি বেঁচে আছি অথচ ৪৫ জন বেঁচে নেই—এ জন্য আমি অপরাধবোধে ভুগতাম।’
তবে পরে তিনি বুঝতে পারেন, দুর্ঘটনাটি ছিল যান্ত্রিক ত্রুটির ফল। এ ঘটনায় পাইলট বা ক্রুদের তেমন কিছু করার সুযোগ ছিল না।
এআই দিয়ে দুর্ঘটনার পুনর্নির্মাণ
চার দশক পর নিজের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন পুষ্প বৈদ। তাঁর মতে, শুধু মুখে ঘটনার বর্ণনা দিলে মানুষ সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না। তাই দৃশ্যের মাধ্যমে ঘটনাটি তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, এআই দিয়ে তৈরি বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে তাঁর মনে হয়েছে, নিজের অভিজ্ঞতাও এভাবে তুলে ধরা সম্ভব। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোও তাঁর ভিডিও তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য।
দুর্ঘটনার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অ্যাবারডিনে একটি বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করা হবে।
উত্তর সাগরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
১৯৮৬ সালের এই দুর্ঘটনার আগে ১৯৮৩ সালে আইলস অব স্কিলির কাছে সমুদ্রে একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত হয়েছিলেন। চিনুক দুর্ঘটনা উত্তর সাগরে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকদের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এ ধরনের আকাশপথের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং নির্মিত চিনুক হেলিকপ্টার ১৯৬১ সালে প্রথম উড্ডয়ন করে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধেও ব্রিটিশ বাহিনী এর সামরিক সংস্করণ ব্যবহার করেছিল।
চার দশক পেরিয়ে গেলেও পুষ্প বৈদের স্মৃতিতে সেই দুর্ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত জীবন্ত। তাঁর ভাষায়, ‘আমি ভাগ্যবানদের একজন।’















